সাহেদের উত্তরার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জাল টাকা উদ্ধার

অনলাইন ডেস্ক ঃঃ

করোনা পরীক্ষায় প্রতারণার মামলায় বহুল আলোচিত বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ১৫ জুলাই ভোর সোয়া ৫টার দিকে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্তবর্তী কোমরপুর গ্রামের লবঙ্গবতী খালের পাশে ইছামতী নদী থেকে অবৈধ অস্ত্রসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার এড়াতে জালিয়াত সাহেদ চুলে রঙ করে গোঁফ ছোট করে বোরকা পরে নৌকাযোগে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করছিল। চেহারা পরিবর্তন করার জন্য সে তার চুলও কালো করে ফেলেছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাত ২টা থেকে ওই এলাকায় অভিযান শুরু করে র‌্যাব সদস্যরা। কিন্তু সে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় গ্রেফতার করতে একটু সময় লাগে। অবশেষে ভোরে তাকে তাকে গ্রেফতার করে। পরে র‌্যাবের হেলিকপ্টারে করে সকালেই ঢাকায় আনা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার দেয়া তথ্যমতে, তাকে নিয়ে উত্তরার তার আরেকটি অফিসে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার জাল টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাবের অভিযান শেষে উত্তরার সেক্টর-১১ এর ২০ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর ‘সিএইচএল বাইতুল ইহসান’ ভবনটির কেয়ারটেকার মো. তারা মিয়া সাংবাদিকদের জানান, এ ফ্ল্যাটের মালিক ইয়াহিয়া খান নামের এক ব্যক্তি। দুই মাস আগে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় সাহেদ। শুনেছি, এখানে একটি ল’ ফার্ম করার কথা ছিল। ভাড়া ছিল ৩০ হাজার টাকা। অফিসও সাজানো হয়েছে। তবে ফার্মটি চালু হয়নি। এ ছাড়া সাহেদের নামে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়া হলেও সে কখনো এখানে আসেনি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উত্তরা অভিযান চালানো হয়। এরপর তাতেক নিয়ে দুপুরে আবার র‌্যাব হেডকোয়াটার্সে কড়া নিরাপত্তায় নেয়া হয়। এরপর র‌্যাব হেযকোয়াটার্সে বিকেল ৩টার দিকে প্রেস বিফ্রিয়ের আয়োজন করা হয়। র‌্যাব সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনার পর সাহেদ ও তার সঙ্গী গ্রেফতারকৃত মাসুদ পারভেজকে নিয়ে অভিযানে যায় র‌্যাব। সেখানে রিজেন্ট গ্রপের এক কার্যালয় থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার জাল টাকা উদ্ধার করা হয়। সে নিজেকে কখনও অবসরপ্রাপ্ত কখনও চাকরিরত সেনা কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতো। কখনও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পরিচয় দিতো এবং সুকৌশলে ছবি তুলে সেটা ব্যবহার করতো। এমনকি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সাহেদ বালু, পাথর ব্যবসায়ীদের ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে প্রতারিত করেছে। সাহেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা পড়েছে। সব কিছু র‌্যাব তদন্ত করে দেখছেন। করোনা টেস্ট জালিয়াতি : ১০ হাজার করোনা টেস্ট পরীক্ষায় ৬ হাজার ভুয়া রিপোর্ট। তার বিরুদ্ধে বহু মামলার বিষয়ে জানা গেছে। সে সবের তথ্য যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে। করোনা পরীক্ষার রিপোর্টের নামে প্রতারণা করছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনা মূল্যে পরীক্ষা করার কথা থাকলেও ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা করে নেয়া হতো এবং পুনরায় পরীক্ষার জন্য ১০০০ গ্রহণ করতো। আইসিইউতে ভর্তি করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করত। এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের অধিক পরীক্ষা করে ৬ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে সাহেদের প্রতিষ্ঠান। একদিকে রোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, আরেক দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিলেরও জন্য জমা দিয়েছে সাহেদের হাসপাতাল রিজেন্ট।

কোথায় আত্মগোপনে ছিল : গত কয়দিন সে কোথায় ছিল জানাতে গিয়ে র‌্যাবের ডিজি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, একেকদিন একেক জায়গায় আত্মগোপনে ছিল। ঢাকা, কক্সবাজার, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সুকৌশলে আত্মগোপনে ছিল সে। সর্বশেষ সাতক্ষীরার কোমরপুর সীমান্তে লবঙ্গবাতি খাল ও ইছামতি নদী দিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করলে সে ধরা পড়ে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কীভাবে ধরা হলো : কিভাবে এই প্রতারককে ধরা হলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের ডিজি বলেন, ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন সাহেদ কী মানের প্রতারণার কাজ করতে পারে। গত কয়েকদিন ধরেই সে এক জায়গা থেকে এক জায়গা পরিবর্তন করছিল। আমরা তাকে ফলো করেছি। এবং সবশেষে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছি। ঢাকা কবে ছেড়েছে প্রশ্নে র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, সে ঢাকা ছেড়েছে আবার ঢাকায় ফিরেছে, আবার বেরিয়েছে। এসবের মধ্যেই ছিল। এই পুরো সময়টাতে সে কখনও ব্যক্তিগত গাড়ি, কখনও হেঁটে, কখনও ট্রাকে চলাচল করছিল। অবশেষে নৌকা দিয়ে পার হওয়ার সময় আমরা তাকে ধরতে সক্ষম হয়েছি। কোমরে থাকা অস্ত্র নিয়ে যা বললেন র‌্যাব ডিজি : করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার মো. সাহেদ গ্রেফতারের পর তার কোমরে থাকা পিস্তলসহ ছবি তোলার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। সাহেদের প্রতারণায় ভুক্তভোগীদের সহায়তা : সাহেদের দ্বারা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেসব ভুক্তভোগীকে সহায়তা করা হচ্ছে। র‌্যাবের ডিজি বলেন, ভুক্তভোগী যারা আমাদের কাছে আসছেন তাদের আমরা আইনানুগ পরামর্শ দিচ্ছি। সহায়তা করছি, কীভাবে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানায় যাবেন বা আমাদের কাছে যদি আসতে চান আমরা সে সহায়তা প্রদান করছি। তিনি বলেন, পালিয়ে থাকার সময় আমরা তাকে ফলো করেছি, সব পয়েন্ট যদি আমরা জানতে পারতাম তাহলে তখনই তাকে ধরতে পারতাম। আমরা যখনই জানতে পেরেছি এবং তাকে পিনপয়েন্ট করতে পেরেছি তখনই তাকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। বোরকা পরে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা : বোরকা পরে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছিল সাহেদ। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরায় সাহেদের গ্রামের বাড়ি। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে সীমান্ত এলাকাগুলোয় র‌্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ভোর সাড়ে ৫টায় সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় সাহেদ বোরকা পরে নৌকায় সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছিল। খবর পেয়ে আমাদের গোয়েন্দা পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ডিবি কার্যালয়ে সাহেদ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে সাহেদকে ঢামেক হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে বুধবার বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে ঢামেকে নিয়ে যাওয়া হয়। মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে। তার প্রতারণার মামলার তদন্তের দায়িত্ব র‌্যাব নেয়ার জন্য যে সব আইনি প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়া মতো র‌্যাব কার্যক্রম করবেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.