রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পুলিশ বেপরোয়া

সংবাদ জমিন, অনলইন ডেস্ক ঃঃ

দেশের অনেক কিছুই এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলছে। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে নানা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগ চলছে ১৫৯ বছর আগের ব্রিটিশ আইনে। এর ফলে পুলিশ বিভাগ একদিকে বাস্তব পরিস্থিতি ও সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের তৃণমূল প্রতিষ্ঠান থানায় কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না জনগণ। দেশের মানুষের প্রাথমিক নিরাপত্তায় ও সারাদেশে ৬৬১টি থানা রয়েছে। এ সব থানায় ইন্সপেক্টর পদ মর্যাদার একজন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রয়েছে। ৬৬১টি থানার ওসির কার্যালয়ে জনগণ বিপদে পড়ে সেবা ও সহযোগিতার জন্য যায়। কিন্তু অনেক থানায় সেবার বিপরীতে উল্টো পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় সেবা গ্রহীতাদের। এটা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন কোন থানায় মানুষ অত্যন্ত ভালো সেবা পান, পুলিশ কর্মকর্তারা ভালো আচরণ করেন। অনেক থানার ওসি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যখন যে সরকার আসে সে সরকারের হয়ে কাজ করে নিজেই লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে। এর প্রভাব পড়ছে থানা এলাকায় সাধারণ মানুষের সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে মানবাধিকার নেই। নারী শিশুর প্রতি সহনশীলতার কথা নেই। এ আইন হলো- যখন যারা রাষ্ট্র চালাবে তাদের অনুকূলে চলবে পুলিশ। এ আইন ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল, স্বাধীন দেশের উপযোগী নয়। ১৯৭৫ সালে ১৫ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে পুলিশ সপ্তাহে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমরা বিদেশি পুলিশ নও। তোমরা স্বাধীন দেশের পুলিশ। তোমরা জনগণের শাসক নয়। সেবক। তোমাদের বাবা মা এদেশে থাকে। সুতরাং তোমরা অন্যায়, দুর্নীতি, অত্যাচারে লিপ্ত হবে না। তোমরা অন্যায় করলে জবাবদিহি করতে হবে।’ জাতির পিতার সেই ভাষণ স্বাধীন দেশের পুলিশের মধ্যে কতটুকু কার্যকর হয়েছে তা নিয়ে খোদ পুলিশের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশ অফিসারদের অভিযোগ, ব্রিটিশ আমলের পুলিশি আইন ও সিস্টেম (পদ্ধতির) পরিবর্তন না করলে থানায় এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটতে থাকবে। বিমানের ইঞ্জিনের ত্রুটি দেখা দিলে সেখানে পাইলট পরিবর্তন করে যেমন লাভ হয় না, তেমনি টেকনাফ থানার ওসিসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাকে সাজা দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও পুলিশ আইনের সংস্কার বা পরিবর্তন হিমাগারে পড়ে আছে। এর ফলে পুলিশে জবাবদিহিতার অভাব দেখা যায়। পুলিশ যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের হয়ে বেশি কাজ করেন। পুলিশ বিধি পরিবর্তন না করায় দিনের পর দিন অনেক থানার ওসি বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে।

এখনই সময় পুলিশ অডিন্যান্স ২০০৭ ও ২০১৩ সালের পুলিশ আইন চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করা। সে আইন এখন হিমাগারে। যার কারণে প্রতি বছর টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপের মতো বহু ওসির অপরাধ শনাক্ত হয়। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে চলতি বছরের করোনাভাইরাস মহামারী পর্যন্ত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নিজের জীবন দিয়ে দেশের জন্য কাজ করেছেন। জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোল মডেল হিসেবে পরিণত হয়েছে। পুলিশের নতুন নতুন ইউনিটে প্রতিদিন বহু সৎ পুলিশ অফিসার নিরলসভাবে দেশের জন্য কাজ করছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের ইমিগ্রেশন বিভাগসহ বহু ইউনিট নিজ নিজ বিভাগে কাজ করে সুনাম অর্জন করেছেন। কিন্তু পুলিশের এসব অর্জন বিচ্ছিন্নভাবে টেকনাফ থানার ওসির মতো অনেক পুলিশ কর্মকর্তার অপকর্মের কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। তিনি গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে এ অবস্থায় এসেছেন। ওসি প্রদীপ কুমার দাস গ্রেফতার হলেও তার গডফাদারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। ওসি প্রদীপের অপকর্মের কারণে এখন বহু পুলিশ কর্মকতা নিজ বাসায় সন্তানদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়ছেন।

পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করা দরকার। শুধু একজন ওসির শাস্তি হলে পরিবর্তন আসবে না। একজন ওসির বিচার করলে পুলিশ ভালো হবে না। পুলিশের কাজের বর্তমান পদ্ধতি, আইন কানুন, বিধি পরিবর্তন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নিয়োগ বদলিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। আইনের শাসন কায়েম করতে হলে পুলিশকে আইন অনুযায়ী চলতে হবে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কিছু কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে ব্যক্তিগত লাভবান হওয়ার জন্য একের পর এক দুর্নীতি করছে। থানার ওসিদের সেবার ওপর পুলিশের সম্মান যেখানে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ওসিরা দীর্ঘদিন এক থানায় থেকে নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি বছর পুলিশ সদর দফতরে পুলিশ আইনে ও তদন্তে কয়েক হাজার পুলিশের শাস্তি হয়। আবার কারও কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। কারো লঘুদণ্ড, কারও গুরুদণ্ড হয়। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়। কেউ অপরাধ করতে গিয়ে পুলিশের অন্য ইউনিট বা সংস্থার সদস্যদের হাতে আটক হচ্ছে। অভিযুক্ত কোন পুলিশ কর্মকর্তা সদস্যের অপরাধের দায়ভার পুলিশ বাহিনী নিবে না। নিজের অপরাধের জন্য নিজেকে ভুগতে হবে। অবশ্য পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফের ঘটনা নিয়ে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভালো মনের কর্মকর্তারা অস্বস্তিতে আছেন। তারা থানায় এএসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়ার পক্ষে মত দেন। আর যেসব ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মত দেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ অফিসার বলেন, দেশের থানাগুলোতে ওসির কাজের ওপর সাদা পোশাকের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো দরকার। তাদের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন পেলে আগেই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। না হলে ওসিরা নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে থানা এলাকায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

পুলিশ পুলিশ বিভাগে ইন্সপেক্টর হিসেবে মঞ্জুরিকৃত পদ আছে ৬ হাজার ৮৬৯টি। বর্তমানে ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত আছেন ৬ হাজার ৬৫৭ জন। অথচ কিছু ওসি বার বার একই থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত থাকছেন। এভাবে অনেকেই প্রভাব বিস্তার করে থানায় থেকে বেপরোয়া হয়েছে। টেকনাফের ঘটনার পর এখন সারাদেশে পুলিশের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপকর্ম একে একে ফাঁস হচ্ছে। মানুষ সাহস করে আদালতে অভিযোগ করছেন। আখাউড়া ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে মামলা হয়েছে। টেকনাফের পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে ওসি প্রদীপ কুমারসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। আবার রাজশাহীর এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে ব্যবসায়ীর মামলা হয়েছে।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ওসিসহ মাঠ পর্যায়ের পুলিশের অপরাধ বন্ধে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অভিযোগকেন্দ্র খোলা হয়েছে। অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা। আর পুলিশের শৃঙ্খলা শাখা থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার পুলিশের শাস্তি হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আর থানার ওসিদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে অপরাধে সংশ্লিষ্ট কর্মকতা ও সদস্যদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। সূত্র-সংবাদ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.