পরিশ্রম যারা বেশি করেন করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের ততই বেশি

অনলাইন ডেস্ক ঃঃ

লায়লা বেগম বয়স চল্লিশ। দুই সন্তান ও স্বামী-স্ত্রী নিয়ে কড়াইল বস্তিতে বাস। স্বামীর পাশপাশি লায়লা নিজেও দিনমজুরি কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে কাজে বাসা থেকে বের হন ফেরেন সন্ধ্যা ৫টায়। বাসায় ফিরেও লায়লা বেগমের বিশ্রামের সুযোগ নেই, ঘরের রান্নাসহ সংসারের সব কাজ করতে হয় তাকে। কড়াইল বস্তির সবচেয়ে সুখী পরিবার বলে মনে করেন লায়লা বেগম। দিনমজুরি ও সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষায় নিয়ে চিন্তা করার সময়ও নেই তার। অবশ্য জুন মাসে তার ছেলে আবদুল্লাহ’র (১৬) জ্বর ও সর্দি হলে স্থানীয় আক্তার ফার্মেসির ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠে। শুধু লায়লা বেগম নয়, বস্তির অধিকাংশ মানুষের মাঝে করোনা নিয়ে উদাসীন দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মুখে মাস্ক ছাড়াই চায়ের দোকান, হোটেল ও মুদির দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন। করোনা যেন বস্তির সেই চিরচিনা দৃশ্যের বিন্দুমাত্র ভাটা ফেলতে পারেনি।

কয়েকদিন কড়াইল বস্তি, মহাখালী সাততলা বস্তি, মিরপুর বেগুনটিলা বস্তি ও কল্যাণপুর পোড়াবস্তি ঘুরে দেখা গেছে, কমবেশি ত্রিশ হাজার খুপরি ঘরে দুই লাখ মানুষের বাস। সরুগলি দিয়ে আসা-যাওয়া করতে একজনের সঙ্গে আরেক জনের শরীর লেগে যায়। সাত-আটটি খুপরির ঘরের জন্য একটি টয়লেট, একটি রান্না ঘর ও গোসল খানা। এক কথায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংক্রামক রোগের সব উপকরণই বিদ্যমান এসব বস্তিতে। এরপরও করোনা নিয়ে বস্তিবাসীর সচেতনতা, আতঙ্ক কিংবা উদ্বেগ নেই। তারা আগের মতোই চায়ের দোকান কিংবা এলাকার মোড়ে মোড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। খালি শরীরে বাচ্চারা দলবদ্ধ হয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। কেউ মার্বেল খেলছে। কড়াইল বস্তিতে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন আবদুর জব্বার, মফিজ, মোশারফ, আক্কাস আলীসহ অনেকে। তাদের কারও মুখে মাস্ক ও করোনা সুরক্ষাসামগ্রী নেই। প্রাণঘাতী করোনার মাঝে বস্তিবাসীদের একত্রে আড্ডা দেখে যে কারও মনে হবে- করোনা নিয়ে এসব মানুষের বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই, নেই সচেতনা। আগের মতোই তারা চলাচল করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। মহাখালী থেকে কড়াইল বস্তির প্রবেশ মুখেই মা-মনি চায়ের দোকান। ক্রেতাদের এতোটাই ভিড় দোকানে এক কাপ চা পেতেও ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। শুধু মা-মনি চায়ের দোকান নয় এমন শত শত চায়ের দোকান, হোটেল ও মোদির দোকানে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। রাজধানীর সব বস্তিরই কমবেশি একই চিত্র। দেশের সবচেয়ে বড় বস্তিগুলোর একটি কড়াইল বস্তি। একঘরে পাঁচ থেকে সাতজন গাদাগাদি করে থাকেন। এখানকার মানুষ করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনা নয়। কেউ করোনা সংক্রমিত হলে একঘরে আলাদা থাকার সুযোগ নেই। সামজিক দূরত্ব বজায় রাখাও অসম্ভব। একবার করোনার বিস্তার ঘটলে ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়বে। চার মাস আগে এভাবেই বলেছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, করোনা সংক্রমিত হয়ে বস্তির মানুষ ও নিম্ন আয়ের মানুষ হাসপাতালে খুব কম এসেছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে রোগীদের পেশাগত বিবরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং হাসপাতালে যাদের মৃত্যু হয়েছে তার বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নি¤œ মধ্যবিত্ত মানুষ। এ বিষয়ে মুগদা হাসপাতালের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম সংবাদকে বলেন, করোনা হচ্ছে জ্বর, সর্দি, কাশির মতো একটি রোগ। বস্তির বেশিরভাগ মানুষের বছরজুড়ে জ্বর, সর্দি, কাশি লেগেই থাকে। তারা করোনা সংক্রমিত হলেও চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে না এসে স্থানীয় ফার্মেসির দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, শুধু বস্তিবাসী নয়, গার্মেন্টের মানুষ করোনা রোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেনি। যারা শারীর পরিশ্রম করেন তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি। বস্তিবাসী চলচ্চিত্র অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের সেই উক্তির মতো- ভোরে শিশিরে খালি পায়ে হাঁটা, অধিক হাসি, পর্যাপ্ত ঘুম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিশ্রম করেন। বস্তিবাসী ধনীদের মতো এসিতে থাকেন না, প্রকৃতির আবহাওয়া থেকে বঞ্চিত হন না। ধনী মানুষ বৃষ্টিতেও ভেজেন না, রৌদ্রে পোড়েন না। প্রকৃতির আবহাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকায় ধনীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে না। ফার্স্টফুড খায়, প্রকৃতির খাদ্য কম গ্রহণ করেন। এসব বিবেচনায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে, যারা ধনী শ্রেণীর মানুষ তারাই বেশি করোনায় সংক্রমিত হচ্ছেন। বস্তিবাসী মনে করছেন, ‘করোনা’ একটি শব্দ। এটি তাদের কাছে কোন রোগ নয়। বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষ কেন করোনায় কম সংক্রমিত এ নিয়ে আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মুগদা হাসপাতাল গবেষণা করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সংবাদকে বলেন, দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ায় আমাদের আশঙ্কা হয়েছিল বস্তির মানুষ বেশি সংক্রমিত হবেন। কিন্তু চার মাসে দেখা গেল, বস্তিবাসীর মানুষ করোনাভাইরাস থেকে কমবেশি সুরক্ষিত আছেন। তবে তারা করোনা সংক্রমিত হয়নি, সেটি বলা যাবে না। তাদের অনেকে করোনা সংক্রমিত হলেও আর্থিক টানাপড়নে হাসপাতালে যাচ্ছেন না বা ভয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছেন না। বস্তির মানুষের করোনা পরীক্ষা ছাড়া সঠিক পরিসংখ্যান সম্ভব বলা সম্ভব হবে না। আরেকটি কারণ হতে পারে, বস্তির মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেন, আলো-বাতাসে থাকেন, এসব কারণে হয়তো তাদের করোনা সংক্রমণ কম হচ্ছে। কড়াইল ও কল্যাণপুর পোড়াবস্তির কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার বেশিরভাগ মানুষ রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, হোটেল কর্মী, ফেরিওয়ালা বা পরিচ্ছন্ন কর্মীর কাজ করেন। তারা প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যান। করোনার কারণে তাদের অনেকেই এখন কর্মহীন। একবেলার খাবার জোগাড় করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে করোনা থেকে রক্ষা পেতে সুরক্ষাসামগ্রী কিনবে কিভাবে। এজন্য বাসিন্দাদের সিংহভাগই মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছেন। করোনা একবার বস্তিতে ছড়ালে ভয়ঙ্কর হবে পরিস্থিতি। মানুষের সংক্রমিত ও মৃত্যুহার বেশি হবে সেজন্য সরকার-বেসরকারি সব উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে বস্তিবাসীদের সজাগ করতে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তারা বলছেন, স্বল্প আয়ের মানুষরাই বস্তিতে বসবাস করেন। তাদের বেশিরভাগেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। কিন্তু দেশের করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার চার মাস পেরিয়েছে বস্তিবাসী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়েনি। বেশিরভাগ বস্তির মানুষের একটাই কথা- করোনা ধনীদের রোগ। কেউ বলছিলেন, আল্লাহ মৃত্যু কপালে লেখে রাখলে যেভাবেই হক মৃত্যু হবে। দেশে করোনাভাইরাসে প্রতিদিন শত শত মানুষ সংক্রমিত হওয়া এবং কমবেশি চল্লিশ জন মানুষের মারা হলেও কল্যাণপুর পোড়াবস্তির কাজল মণ্ডল, ফজলু মিয়াসহ আরও কয়েকজন বিশ্বাস করতে চান না। তারা বলছেন, করোনা কোন রোগ নয়, অন্যান্য রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে, সেটি করোনা রোগী ডাক্তাররা চালিয়ে দিচ্ছে। কাজল ম-ল নিজেও কয়েকদিন জ্বর ও সর্দিতে ভুগছিলেন। প্যারাসিটাল ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়েছেন। কাজল ম-ল বলেন, কল্যাণপুর বস্তিতে দেড় লাখ মানুষ বাস করে, গত কয়েক মাস ধরে শুধু করোনা করোনা শুনছি। কোথায় আমাদের বস্তিতে তো কেউ করোনা সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে গেলেন না। করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের একমাত্র উপায় পরীক্ষা করা। বস্তিতে যারা বসবাস করছেন তারা করোনা পরীক্ষায় আগ্রহী নন। জ্বর, সর্দি ও কাশি হলে স্থানীয় ফামের্সি থেকে ওষুধ কিনছেন। করোনা প্রতিরোধে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বলছে, শারীরিক পরিশ্রম, বায়াম, ঠিকমত ঘুমানো ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করা। যার প্রত্যেকটি বস্তিবাসীদের মধ্যে রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, রাজধানীর বস্তিগুলো ঘনবসতিপূর্ণ। একজন করোনা সংক্রমিত হলে সহজেই অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে যেত। এতে বর্তমানে করোনায় যতজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা দ্বিগুণের বেশি হতো। বস্তিতে কেন করোনা সংক্রমণের প্রবণতা কম সেটি গবেষণা করা দরকার। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, বস্তির মানুষ করোনা সংক্রমিত হচ্ছেন, কিন্তু হয়তো শনাক্ত হচ্ছেন না। যারা করোনা সংক্রমিত হন তাদের শতকরা ৮০ শতাংশেরই লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। আবার যারা কর্মঠ তারা হালকা সর্দি কাশি হলে বলেনও না। সচেতনতার অভাবে সেটা আমলে নেন না। সবকিছু মিলিয়ে কম বলা যাবে না। হয়তো আমরা খবর পাচ্ছি কম। সংক্রমণ কম এটা বলতে আমাদের স্টাডি করা লাগবে। কিন্তু এ ভাইরাসের যে চরিত্র তাতে করে বেশি হওয়া ছাড়া কম হওয়ার কোন যুক্তি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৪ সালে বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোকগণনা জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এক হাজার ৬৩৯টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে খানা বা ঘর বা পরিবার রয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৩৪০টি। আর খানাসদস্য চার লাখ ৯৯ হাজার ১৯ জন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বস্তি রয়েছে এক হাজার ৭৫৫টি। এসব বস্তিতে খানা বা ঘর বা পরিবার রয়েছে ৪০ হাজার ৫৯১টি। এসব ঘরে বসবাস করেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৬ জন। তবে গত কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কত জন করোনা সংক্রমিত হয়েছে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা থাকলেও কোন বস্তিতে কত জন সংক্রমিত তার কোন তথ্য নেই।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.