অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র

অনরাইন ডেস্ক ঃঃ
তাঁর সুবিপুল পাণ্ডিত্য ও দুনিয়াব্যাপী খ্যাতি তাঁকে নানা সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তো পি-এইচ.ডি. ডিগ্রি পেয়েছিলেনই, এছাড়া লাভ করেছিলেন নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক (১৯৫৬)। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান লেখক সংঘ তাঁকে দেয় দাউদ পুরস্কার। ১৯৭০ সালে পান বাংলা একাডেমির তরফে সাহিত্য পুরস্কার। শিক্ষায় তাঁর আসামান্য কৃতিত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদক’দ্বারা ভূষিত হন ১৯৮৫-তে। ১৯৯৪ সালে পান ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’সিরিজের জন্য আনন্দ পুরস্কার। ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. লিট. ডিগ্রিতে ভূষিত করে।অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায়, এন্টালির কাছে ক্যান্টোফার লেনে। তাঁর পুরো নাম আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। তাঁর পিতা এ.টি.এম. মোয়াজ্জেম ছিলেন একজন খ্যাতনামা হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন। বহিরাগত খানদানি বংশের মেয়ে। মূলত গৃহবধূ হলেও রীতিমতো লেখাপড়া জানতেন। ছিলেন সাহিত্য-রসিকাও। তাঁর নামে ‘হাতেম তাই’-এর একটি বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ পাওয়া যায়। আনিসুজ্জামানের পিতামহের নাম শেখ আব্দুর রহিম। ইনিও গ্রন্থকার। তবে ইসলাম ধর্মের বইপত্র লিখতেন বেশি। কোরআনের বাংলা অনুবাদ একটি প্রকাশ করেছিলেন। লিখেছিলেন নামাজ শিক্ষার বইও। তবে তাঁর খ্যাতি রটেছিল দুটি পত্রিকার সম্পাদনায়। দক্ষ হাতে তিনি প্রকাশ করতেন সাপ্তাহিক ‘মিহির’ ও মাসিক ‘সুধাকর’। এই সুবাদে কলকাতার বিদ্বৎসমাজে আব্দুর রহিম ছিলেন একটি পরিচিত নাম। যাইহোক, আনিসরা ছিলেন সাত ভাই-বোন। তার মধ্যে দুজন ক্ষণজীবী। জীবিত পাঁচজনের মধ্যে আনিস ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান, পুত্র হিসেবে জ্যেষ্ঠ। তাঁর ওপরে তিন দিদি। তাঁর পরে এক ভাই। তিন দিদিই কিছু-না-কিছু লেখাপড়া জানতেন। বড়দিদি তৈয়বুন্নেসা তো রীতিমতো কবিতা লিখতে সক্ষম ছিলেন। সেসব কবিতা ছাপা হতো ‘সওগাত’, ‘গুলবাগিচা’র মতো পত্রিকায়। আনিসুজ্জামানের পিতৃকুলের তুলনায় মাতৃকুল ছিল আরো খানদানি। তাঁরা ছিলেন বহিরাগত আশরফি মুসলমান। সবাই প্রায় উচ্চশিক্ষিত ও বড় বড় চাকুরে। তাঁদের পরিবারেও লেখালেখির চল ছিল। সুতরাং জন্মাবধি সাহিত্য-সংস্কৃতির জ্যোতির্বলয়ের মধ্যে আনিস ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর পিতা খ্যাতিমান চিকিত্সক হওয়ায় অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষ আসতেন তাঁদের বাসায়। ‘কাল নিরবধি’- যা তাঁর আত্মজীবনের প্রথম পর্বের সানুপুঙ্খ বিবরণে ঠাসা- পড়লে ধারণা হয় সেকালের বড় বড় মন্ত্রী, আমলা, পদস্থ আধিকারিকদেরকে ছোট্ট আনিস আবাল্য স্বচক্ষে দেখে এসেছেন। আর সেইসব নামজাদা বিদগ্ধ মানুষের সান্নিধ্যে আসার কারণে বালকটির মধ্যে প্রথম থেকেই জেগে উঠেছিল জ্ঞানের স্পৃহা, তৈরি হয়েছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

আনিসুজ্জামানের পৈতৃক বাসস্থান অখণ্ড ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত মোহাম্মদপুর গ্রামে। এটি বেড়াচাঁপার বিখ্যাত প্রত্ননিদর্শনস্থল চন্দ্রকেতুগড় থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। তাঁর পিতা, পিতৃব্য ও অন্যান্য আত্মীয় পরিজনরা এখানেই আবাল্য থাকতেন। এমনকি তাঁর মাতুলালয়ও এই অঞ্চলেই। তবে সংস্কৃতির উজ্জ্বল পীঠস্থান কলকাতা নগরীর সঙ্গে এ পরিবারের যোগাযোগ ছিল নিয়মিত, বিশেষত তাঁর পিতামহের লেখালেখি ও পত্রিকা সম্পাদনার সূত্রে। ১৯৩৬ সালে মোয়াজ্জেম বসিরহাট ছেড়ে স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। এসে ওঠেন এন্টালির কাছে ৩১ ক্যান্টোফার লেনের এক ভাড়াবাড়িতে। সেই বাড়িতেই ১৯৩৭-এ আনিসুজ্জামানের জন্ম। পরে এখান থেকে পরিবারটি উঠে আসে পার্কসার্কাসের মেহের লস্কর লেনে। ১৯৩৮ সালে আবার ঠাঁই বদল হল। এবার তাঁরা উঠে এলেন ওই অঞ্চলের ১০ নম্বর কংগ্রেস এক্সিবিশন রোডে। কলকাতায় শেষবারের মতো তাঁরা বাড়ি বদলান ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে। একই রোডের বিপরীত দিকে ৭/এ নম্বর দোতলা বাড়ি। কলকাতা তখন জাপানি বোমাতঙ্কে থরহরি কম্পমান।

বালক আনিসের শৈশবশিক্ষা শুরু হয়েছিল বাড়িতেই। মা-দিদিরাই দেখিয়ে শুনিয়ে দিতেন। সামান্য একটু বড় হলে দিদিদের শিক্ষক বেনজীর আহমেদ তাঁকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। তবে তখনও তার স্কুলে যাওয়া ঘটেনি। ১৯৪৩ সালে সাত বছরে পা দিতেই তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্কসার্কাসের একটি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে। এখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন আনিস। তারপরই ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল এবং ধর্মের ভিত্তিতে হল দেশভাগ। মোয়াজ্জেম কী করবেন এ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর পরামর্শে কলকাতা ছেড়ে পূর্ববঙ্গে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা গিয়ে উঠলেন প্রথমে খুলনায় এক নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে। এখানকার স্কুলে বছরখানেক আনিস পড়েছিলেন। পরে খুলনা থেকে আবার ঘটল স্থান বদল। এবার ঢাকার শান্তিনগর। তখন আনিসের বিদ্যালয় হল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রিয়নাথ হাইস্কুল। ১৯৫১ সালে এই স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশনে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে পাশ করে আনিস। তার পরিবারে এটাই প্রথম সর্বোচ্চ ডিগ্রি। ১৯৫৩ সালে আই.এ. পাশ করলেন তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে। পরে বি.এ. ও এম.এ. পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুটিতে তাঁর বিষয় ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। দুটিতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থানাধিকারী। ইতিমধ্যেই এই পরিবারটি বাসা বদল করে ঢাকার ঠাটারিবাজারে চিরস্থায়ী বসতি গেড়ে ফেলেছে।

শিশু আনিসের বয়স বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার নানা চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটছিল দ্রুত। তাদের পরিবারটি ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত ছিল। পার্কসার্কাসের স্কুলে হিন্দুর ছেলেরাও পড়ত। তাদের সঙ্গেও তার ভাব ছিল যথেষ্ট। সরস্বতী পুজোতেও বালক আনিস অংশগ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। কিন্তু যখন ১৯৪৬-এর আগস্টের মাঝামাঝি কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দিল, তখন থেকে কিশোর আনিস প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের একটা নেতিবাচক দিক দেখতে পেলেন। যে হিন্দু গোয়ালা প্রতি সকালে তাদের দুধ দিয়ে যেত, তাকে যখন প্রকাশ্যে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, তা দেখে আনিস শিউরে উঠেছিল। ১৯৪৭-এ দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ব্যাপারটার রাজনৈতিক গুরুত্ব না বুঝলেও তার হাত ধরে যে দেশভাগ ও সেইসূত্রে দেশত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছিল, বছর-দশেকের একটি বালকের মনে তা দাগ কেটে দিয়েছিল যথেষ্ট। ভারত ভূখণ্ডে থাকা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এ সময় দেখা দিয়েছিল ভীষণ উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে যাঁরা মুসলিম লিগের সমর্থক ছিলেন। এই পরিবারটি অতিসক্রিয় না হলেও লিগের দাবির পক্ষে ছিল। তাই কলকাতায় হয়তো উৎপীড়নের ভয় ছিল তাদের। তার আঁচ এসে লেগেছিল ছোট্ট আনিসের মনে। পূর্ব পাকিস্তানে থিতু হওয়ার পর এই উৎকণ্ঠা, ভীতিবোধ তার কাটে বটে কিন্তু সে দেশে ততদিনে রাষ্ট্রভাষাকে ভিত্তি করে শুরু হয় ডামাডোল। স্কুলের ছাত্র হলেও তার কিছু আভাস পেতে শুরু করেছিল আনিস, বিশেষত ঢাকাতে পড়াশোনার সময়। ১৯৪৮-এ পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পাশাপাশি ৭০% দেশবাসীর মাতৃভাষা বাংলা-র দাবি ওঠে। দাবি আদায় করে নেবার লক্ষ্যে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আনিসের বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। আন্দোলন তার তুঙ্গে পৌঁছায় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। পনেরো বছর বয়সী আনিসুজ্জামান সে সময় ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। সদ্য তরুণটি তখন উদ্দীপনায় টগ্বগ্ করে ফুটছেন। সংগ্রামীদের ডাকে সাড়া দিলেন তিনি ও তাঁর সহপাঠীরা। তাঁর আত্মজীবনীতে সেই একুশে ফেব্রুয়ারির রক্ত-ঝরানো দিনটির কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ধরা আছে। তিনি, তাঁর সহাধ্যায়ী বন্ধুরা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্ররা পতাকা হাতে সমবেত হয়ে কীভাবে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন, তা তাঁর ‘কাল নিরবধি’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারা যায়। সেদিন শাসকদলের সৈনিকদের গুলিতে প্রাণ গিয়েছিল রফিক, সালাম, বরকত, আব্দুলদের। এইভাবে রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষত যুক্ত হওয়ার ফলে আনিসুজ্জামানের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রবল দেশপ্রেম, প্রখর রাষ্ট্রীয় চেতনা। সেই থেকে তিনি আজীবন দেশের মর্যাদা রক্ষার ব্রতে অবিচল এক নাগরিক হিসেবে নিজের মেধা-মনন-ভাবসম্পদ দিয়ে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করে গেছেন।

ছাত্রাবস্থায় যেমন ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন আনিসুজ্জামান, তেমনি তখন থেকেই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দিয়েছিলেন নেতৃত্ব। যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্মানিক স্নাতক বাংলার অন্তিম বর্ষের ছাত্র, সেই ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে আয়োজিত এশীয় লেখক সম্মেলনে সদস্যরূপে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনটি গৌরবান্বিত হয়ে উঠেছিল ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, ইজাজ বাটালভী, কাকা কালেলকর, অমৃতা প্রীতম, সাজ্জাদ জহির, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, সজনীকান্ত দাস-এর মতো এক ঝাঁক যশস্বী এশীয় লেখকদের উপস্থিতিতে। আর সেই সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আরও অনেকের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ১৯ বছরের বি.এ. ক্লাসের ছাত্র আনিসুজ্জামান। সেই শুরু। এরপর থেকে নানা সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি ঘটতে থাকবে, পাবেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকৃতি। এই বয়সেই সহাধ্যায়ীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমির মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতি ও নৃত্যকর্মকে ধরে রাখা এবং দেশে নৃত্যগীতবাদ্য প্রভৃতির চর্চা সম্প্রসারিত করা। এর পৃষ্ঠপোষকতা জোগাড় করেছিলেন এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মতো প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে, যাঁরা ছিলেন তাঁর পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ। এই সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় সুচিত্রা মিত্র ও দেবব্রত বিশ্বাসের অনবদ্য সঙ্গীত পরিবেশনে রবি ঠাকুরের গানের সবচেয়ে বড় জলসা, পরিবেশিত হয় শান্তিদেব ঘোষের পরিচালনায় শ্যামা নৃত্যনাট্য, অভিনীত হয় শম্ভু মিত্রের বহুরূপী দলের অসামান্য প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ ও তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়া তার’। এইসব ঘটনা সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে আনিসুজ্জামানের দক্ষতা ও ব্যাপ্তিকে চিনিয়ে দেয়।

অনার্স পাশের পর এবার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পালা। একই বিভাগ, সুতরাং অপরিচিতের কুন্ঠা তাঁর নেই। ইতিমধ্যেই শিক্ষকরা চিনে ফেলেছেন তাঁর মেধা, দক্ষতা, মেজাজ। ঢাকাতে পড়াশোনার কালে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মুহম্মদ আবদুল হাই, মযহারুল ইসলাম, দীন মুহম্মদ, মুনীর চৌধুরীর মতো যশস্বী পণ্ডিতদেরকে। খুব কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মুহম্মদ এনামুল হকের। বাংলা একাডেমির পরিচালক আব্দুল কাদিরের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ১৯৫৭-তে এম.এ. ডিগ্রি লাভের পর শুরু করলেন গবেষণা। একাজে বাংলা একাডেমির গবেষণাবৃত্তি লাভ করেছিলেন তিনি। তাঁর গবেষণা-নির্দেশক ছিলেন তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান মুহম্মদ আবদুল হাই। বিষয় – ‘Thoughts of the Bengali Muslims as reflected in Bengali Literature during the British Period (1757-1947)’। গবেষণার শুরুতেই ১৯৫৮ সালে ‘উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজ ও সাহিত্য’ বিষয়ক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে স্ট্যানলি ম্যারন পুরস্কার লাভ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে উল্লেখ্য যে, বি.এ. প্রথম বর্ষে প্রবেশের আগেই আনিসুজ্জামান তাঁর সাহিত্য বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছিলেন ‘আনন্দমঠ ও বঙ্কিম-প্রসঙ্গ’ নামে, যেখানে বঙ্কিম-বিরোধী ধারণার অবসান ঘটাতে তিনি উদ্যোগী হন এবং এর দরুন লোকসাহিত্যবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন উত্তেজিত হয়ে তাঁকে পাকিস্তান থেকে বের করে দেওয়া উচিৎ বলে কঠোর অভিমত ব্যক্ত করেন। এর আগের বছরের আগস্ট মাস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে গবেষণামূলক যে ‘সাহিত্য পত্রিকা’ প্রকাশ পেতে শুরু করে তার দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে পত্রিকা দেখাশোনার দায়িত্ব পান কুড়ি বছর বয়সী এই যুবক। এতে বিশেষজ্ঞ-পরীক্ষিত হয়ে তাঁর নিজের গবেষণাধর্মী ৬টি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, যাদের মধ্যে প্রথমটি ছিল দোভাষী পুথির প্রথম রচয়িতা শাহ গরীবুল্লাহকে নিয়ে। অচিরেই ১৯৫৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক পদে যোগ দেন, তবে সেটা অ্যাডহক ভিত্তিতে। পরে পদে স্থায়ী হন। স্থায়ী হওয়ার আগেই বিবাহ বন্ধনে (১ অক্টোবর ১৯৬১) আবদ্ধ হন। পত্নীর নাম সিদ্দিকা, ডাকনাম বেবি।

আনিসুজ্জামান তাঁর ‘ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯৪৭)’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি জমা দিয়েছিলেন ১৯৬১-র এপ্রিলে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে বিলম্বিত হয়ে ডিগ্রি পেতে পেতে কেটে যায় পাক্কা এক বছর। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক ডামাডোল। আনিসুজ্জামানের পরবর্তী জীবনধারা এই রাজনৈতিক বাতাবরণের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় যে-তথ্যটি এখানে উল্লেখ্য সেটি হল ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দি গ্রেপ্তার হন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের শাসনামলে। এরপর কারারুদ্ধ করা হয় আওয়ামি লিগ নেতা শেখ মুজিব ও তাঁর সহচরদের। ফলে পরিস্থিতি খুবই উত্তাল হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে লাগে তার ঢেউ। বার্ষিক সমাবর্তন বাতিল হয়। তাই পিএইচডি ডিগ্রিটি হাতে পেতেও বিলম্ব ঘটে। যাইহোক, এই গবেষণাপত্রের পরীক্ষক ছিলেন তিনজন- বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মধ্যযুগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুহম্মদ এনামুল হক এবং ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-খ্যাত অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের রিপোর্টে কাজটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।

মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে সামনে রেখে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন ১৯৫২-য় তা এক দশক পেরিয়ে আরও জোরদার হতে শুরু করে পাকিস্তান সরকারের নানা দমনমূলক নীতির কারণে। উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলি সাধারণত বুদ্ধিজীবীদের আবাসস্থল হয়ে থাকে। সুতরাং যাবতীয় রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচিত হয় সেগুলি। আর ঢাকা যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী এবং তার কেন্দ্রস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তাই স্বভাবতই এই শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানটি বিপ্লব ও বিদ্রোহের ভরকেন্দ্র (এপিসেন্টার) হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এর বাংলা বিভাগ, যেখানে বাঙালির মাতৃভাষা ও তার সাহিত্য নিত্য নিয়মিত চর্চা হয়ে থাকে। তাই সেদিন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পুষ্ট করতে বাংলা বিভাগের অধ্যাপকরা সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নবীন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৬৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে পরপর সাতদিন মূলত বাংলা বিভাগের সক্রিয় উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় পালন করে ‘ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ ১৩৭০’। আনিসুজ্জামানের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল অনুষ্ঠানটিকে সুচারুভাবে আয়োজন করার। এর যে স্মারকপত্র সেদিন বেরিয়েছিল তার প্রকাশনাগত দিকটির পূর্ণ দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এই সময় থেকেই আনিসুজ্জামানের আন্তর্জাতিক সরস্বত যোগাযোগগুলি গড়ে উঠতে থাকে। তিনি দেশের বাইরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আলোচনাচক্রে প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করতে শুরু করেন। ১৯৬৩-র মাঝামাঝি পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলে যোগ দিয়ে যাত্রা করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই সফরের ব্যবস্থাপনায় ছিল পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিল। আর এই বছরের শেষদিকে করাচিতে ‘Culture of two worlds’ শিরোনামের আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশ নেন, যে অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিল ইউনাইটেড স্টেটস্ এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন।

১৯৬৪ সালে আনিসুজ্জামান গেলেন আমেরিকায়, ফুলব্রাইট বৃত্তি পেয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য। এবার তাঁর লক্ষ্য পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন। বৃত্তিটি পেতে তিনি আবেদন করেছিলেন ইউনাইটেড স্টেটস এডুকেশন ইন পাকিস্তান-এ। গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণে ইয়ংবেঙ্গলদের ভূমিকা। এক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ অধ্যাপক এডওয়ার্ড সি. ডিমক। ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে তিনি দেশ ছাড়েন ১৯৬৪-র ১০ অক্টোবর। ফিরে আসেন পরের বছর ১০ আগস্ট। অর্থাৎ পাক্কা দশ মাস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু গবেষণার তুলনায় বোধহয় তাঁকে বেশি টেনেছিল আমেরিকা ঘুরে দেখার নেশা। এই ক’টা মাস যেন তাঁর পায়ের নিচে ছিল সর্ষে। গবেষক হিসেবে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস্ হাউস। সেখানে বহিরাগত ছাত্ররা যে ‘পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন’ করতেন, তিনি নবাগত হয়েও সক্রিয়তার গুণে তার সভাপতি নির্বাচিত হন। অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সর্বদা চেষ্টা করে গেছেন পাকিস্তানি ও ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যেকার দূরত্ব ঘোচাতে। তাঁর মতে, আমেরিকার ওই সময়টা ছিল দক্ষিণ এশীয় বিদ্যাচর্চার স্বর্ণযুগ। স্কলার হিসেবে আনিসুজ্জামানকে এখানে চার-চারটি বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। এছাড়া একাধিক সারস্বত সম্মেলনে বক্তা হিসেবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন সানফ্রান্সিসকো, ব্লুমিংটন, বোস্টনে। ১৯৬৫-র এপ্রিলে অ্যাসোসিয়েশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ-এর বার্ষিক সম্মেলনে সানফ্রান্সিসকোতে গিয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন ১৯৪৭-পূর্ববর্তী বঙ্গদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর। ওই বছর জুনে ব্লুমিংটনে যান শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে। আমেরিকার বিখ্যাত উৎসব ‘থ্যাংকস্-গিভিং সেরেমনি’। তাতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন জেনেসিও। এছাড়া দেশটাকে দুচোখ ভরে দেখতে ছোটেন নিউইয়র্ক, বোস্টন, ওয়াশিংটন ডিসি। প্রচুর পণ্ডিত জ্ঞানী-গুণী মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। যেমন বঙ্গ-বিশারদ অধ্যাপক স্টিফেন হে কিংবা মহাভারতের ইংরেজি অনুবাদক জে.ভি. ভ্যান-বুইটেনেন, যিনি সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টা করে মোট ১২ বছরে সমগ্র মহাভারত অনুবাদে মনোনিবেশ করেছিলেন। নিজের কাজের বাইরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন তিনি। প্রথমত, পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে বিদেশের মাটিতে জমজমাট অনুষ্ঠান ; দ্বিতীয়ত, আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের উপর যেসব গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে তার অভিসন্দর্ভের বিষয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা নির্মাণ ; এবং তৃতীয়ত, একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে গ্রথিত হওয়ার উদ্দেশ্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যের মুক্তি’ ও ‘ডব্লিউ বি ইয়েটস্ ও কলাকৈবল্য’ নামে দুটি বাংলা প্রবন্ধের ইংরেজি অনুবাদ। দেশে ফেরার পথে ইংল্যাণ্ড ঘুরে এলেন। কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আনলেন ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি ও ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি থেকে। দেশে ফিরে এসে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মক্ষেত্রে। ততদিনে ১৯৬৫-র এপ্রিলে শুরু হওয়া পাক-ভারত যুদ্ধ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তির কারণে থেমে গেছে।

১৯৬৫-র শেষ থেকে ’৬৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আকাশবাণী ঢাকা ও পাকিস্তান দূরদর্শন কেন্দ্রের বেশকিছু প্রোগ্রামে অংশ নেন আনিসুজ্জামান। অবশ্য সেগুলো ছিল মূলত সাহিত্য-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান। পরের বছর পাকিস্তান কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন-এর ঢাকা কেন্দ্রের অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তিনি। লাহোরে যান National Seminar on Drama-তে আমন্ত্রিত হয়ে। ১৯৬৭-র জুনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন সরকারি ফতোয়া জারি করলেন। যাতে বলা হল : পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ-বিরোধী রবীন্দ্রসংগীত আর প্রচার করা হবে না, এমনকি অন্যান্য রবীন্দ্রগানের প্রচারও কমিয়ে দেওয়া হবে। এটা যে বঙ্গ সংস্কৃতির ওপরে জোরালো আঘাত ওপারের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই সেটা বুঝলেন। আনিসুজ্জামান ও তাঁর মতাবলম্বী কয়েকজন এগিয়ে এলেন রবীন্দ্র-বিরোধী পাকিস্তানি অবস্থানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রতিবাদী জনমত গড়ে তুলতে। তাঁরা স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন অসংখ্য মানুষের এবং তা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করলেন। ঠিক এই সময়টায় তাঁর দুই ছাত্র আহমদ ছফা ও কাজী সিরাজ তাঁকে অনুরোধ করলেন বঙ্গসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্ন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পূর্ব বাংলার লেখকদের ভাবনা-চিন্তার একটি সংকলন বের করতে। কারণ দু’বছর আগের পাক-ভারত যুদ্ধের পরে পুব বাংলায় রবীন্দ্রনাথের বই সহ যাবতীয় ভারতীয় প্রকাশনা আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আনিসুজ্জামানও এটাকেই সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং জনা পঞ্চাশেক বুদ্ধিজীবীকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে লিখতে অনুরোধ করলেন। লেখকরা সবাই ছিলেন ওপার বাংলার। তাঁর আবেদনে সাড়া দিলেন অনেকেই। শেষ পর্যন্ত তাঁর একক সম্পাদনায় ১৩৭৫ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ প্রকাশ পেল মোট ৩০ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের লেখা সম্বলিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামের গ্রন্থটি। এর আগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এমন সারস্বত উদ্যোগ আর দেখা যায়নি।

১৯৫৯ থেকে টানা ১০ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে কাজ করার পর আনিসুজ্জামান রিডার পদে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৯ সালের জুন মাসে। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এর মাত্র তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে পান সৈয়দ আলী আহসানকে। ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বজ্রগর্ভ মেঘের সঞ্চার হতে শুরু করেছে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশব্যাপী যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামি লিগ বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু জুলফিকার আলি ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, তাঁর দল পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির সহযোগিতা না পেলে কেউ সংবিধান প্রণয়ন করতে পারবে না। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রবল অন্তর্বিরোধ চলতে থাকে। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকায় যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তাতে স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ চৌত্রিশ বছর বয়সী আনিসুজ্জামানের কাছে মনে হয়েছে, এই তেজোদীপ্ত উচ্চারণ যেন পৃথিবীর বুকে একটি নতুন জাতির জন্ম দিল। দেশবাসীর সঙ্গে তিনিও ভাসলেন ভাষাভিত্তিক দেশপ্রেমের জোয়ারে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা শুরু করে দিলেন নানা রকমের উদ্যোগ ও আয়োজন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতার লক্ষ্যে তাঁরা নানা জায়গায় সভা ও মিছিল করলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিসেবীদের একত্রিত করে গঠন করলেন ‘শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘ’। সংগঠনটির অন্যতম সহ-সভাপতি হন আনিসুজ্জামান। কিন্তু পূর্ববঙ্গবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির প্রতিরোধ সত্ত্বেও ২৫ মার্চ রাত থেকে শুরু হল জেনারেল টিক্কা খান ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী-প্রধান জেনারেল হামিদ খানের নেতৃত্বে বাঙালি-নিধনযজ্ঞ। আত্মরক্ষার্থে স্বদেশ ও স্বজনদের ছেড়ে আনিসুজ্জামান তাঁর স্ত্রী ও কন্যা সহ ভারতের মাটিতে নিলেন আশ্রয়। প্রথমে আগরতলায়, পরে সেখান থেকে কলকাতায়। কলকাতায় ততদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহারথীরা ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছেন। তাঁদের আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বসে। এর পাশাপাশি গঠিত হয়েছে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’। তার সহায়তায় তৈরি হল পূর্বপাকিস্তানের শিক্ষক সমিতি, যার সম্পাদক পদে বৃত হলেন আনিসুজ্জামান (২১ মে ১৯৭১)। এই সমিতির ওপর দায়িত্ব বর্তেছিল ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন সংকটের স্বরূপটি তুলে ধরা এবং তাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায় করা। এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে আনিসুজ্জামান তাঁর চার-পাঁচজন সহযোগীকে সঙ্গে করে গিয়েছিলেন আলিগড়, বেনারস, দিল্লি ও জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের কাছে। সাক্ষাৎ করেন তাঁরা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও। পরে যে ভারতের তরফে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সাহায্য প্রদত্ত হয়েছিল সেই সহযোগিতার পথকে সুগম করেছিল শিক্ষক সমিতির এই কূটনৈতিক দৌত্য। মুক্তিযুদ্ধকালীন এই অন্তর্বর্তী ইতিহাসটি চমৎকার ভাবে আনিসুজ্জামান লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর দ্বিতীয় আত্মকথা ‘আমার একাত্তর’ গ্রন্থে। অবশেষে স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের জয়লাভ। মুক্তিযুদ্ধের গোটা পর্বে একজন জাতীয়তাবাদী ও সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁর ভূমিকা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধের কালে এই প্রখর সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষটি তাঁর আন্তরিকতা, কর্মদক্ষতা ও দেশপ্রেমের নিষ্ঠার কারণে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের কাছে এক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সহায়ক হয়ে উঠেছিলেন। তাই আমরা দেখতে পাই, যুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে ডাক পাচ্ছেন আনিসুজ্জামান এবং একজন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী হয়ে তাতে যোগদান করছেন। ১৯৭২-এ যখন স্বাধীন বাংলাদেশ সদ্যোজাত সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল, তখন তাঁকে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য করা হয়। এই কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ডঃ কুদরাত-ই-খুদা। একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবে এক নবগঠিত দেশের নবীন প্রজন্মের শিক্ষানীতি নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সুপারিশ করেছিলেন বাধ্যতামূলক সর্বজনীন অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার, যার পাঠ্যসূচি স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষায় হবে অভিন্ন। এই শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ থেকে বাড়িয়ে আট বছর করারও প্রস্তাব ছিল, যা একেবারেই নবসৃজ্যমান রাষ্ট্রের পক্ষে বাস্তবমুখী। আনিসুজ্জামান চিরকালই শিক্ষকতার বৃত্তিকে মহৎ বৃত্তি হিসেবে সম্মান জানিয়ে এসেছেন, আর সেই কারণেই বঙ্গবন্ধু তাঁকে যেচে শিক্ষা-সচিবের দায়িত্ব দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ তিনি জানতেন আমলাতন্ত্র হল প্রশাসনের এমন এক যান্ত্রিক ব্যবস্থা যা একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষের হাত-পা বেঁধে ফেলার চমৎকার একটি পদ্ধতি এবং ক্ষমতালিপ্সুদের উত্তরোত্তর পদোন্নতি-প্রতিযোগিতার সেরা একটি ময়দান। পাকিস্তানি প্রশাসন-মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে-সংবিধান রচিত হয় তার বাংলা ভাষ্যের তথা অনুবাদ কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। তাঁর নিপুণ ভাষাজ্ঞান, অনন্যসাধারণ পাণ্ডিত্য এই বিশেষ গৌরবজনক ভূমিকায় তাঁকে বৃত করে।

১৯৭৩ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যান প্যারিস। উদ্দেশ্য — ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ওরিয়েন্টালিস্টের দ্বিশতবর্ষ পূর্তির উৎসবে যোগদান। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড্যানিয়েল থর্নার। এই সম্মেলনের একটি বিদ্যায়তনিক অধিবেশনে আনিসুজ্জামানকে সভাপতিত্বও করতে হয়। এই বছরের অক্টোবরে আবার বিদেশ ভ্রমণ। এবার সোভিয়েত রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে। সেখানে ওয়ার্ল্ড পিস ওয়েভে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন তিনি। তার আগে গিয়েছিলেন হাঙ্গেরিতে, বাংলাদেশ আফ্রো-এশীয় গণসংস্কৃতি পরিষদের সদস্য হয়ে। এখানে স্বতন্ত্রভাবে আহূত হন লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবার জন্য। এরই কাছাকাছি সময়ে ফ্রান্সের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ‘Inequality’ বিষয়ক সেমিনারেও ডাক পান তিনি এবং সেখানেও বক্তৃতা করেন।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’ থেকে ডাক এল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি। কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে সপরিবারে ইংল্যান্ডে যাত্রা করলেন ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪। পড়াশোনার পাশাপাশি এবারের লন্ডন বাসে বিবিসি (বাংলা)-তে তাঁর অনুষ্ঠান করার সুযোগ এসে গেল। তিনি এর প্রায় নিয়মিত কথকে পরিণত হয়ে গেলেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনাকেন্দ্রিক ‘প্রবাহ’তে নানা প্রসঙ্গের কথিকায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে লাগলেন তিনি। সেই সঙ্গে ছিল বাঙ্গানুবাদের কাজও। পরের বছর অক্সফোর্ডের নাফিল্ড কলেজে আয়োজিত আলোচনাচক্রে পড়লেন প্রবন্ধ ‘Towards a Redefinition of Identity : East Bengal, 1947-71’। এ লেখাটি ভেঙে পরে তৈরি হয় ‘স্বরূপের সন্ধানে’। তাঁর এমনই আরেকটি বক্তৃতা ‘The World of the Bengali Muslim Writers in the 19th Century(1870-1920)’। এটি প্রদান করেন ব্রাইটনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সেমিনারে। তাঁকে আহ্বান করেছিলেন ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’-খ্যাত অধ্যাপক রণজিৎ গুহ। পরে এরও রূপান্তর সাধন করেন ‘বাঙালি মুসলমান লেখকদের ভাবজগত(১৮৭০-১৯২০)’ শিরোনামের প্রবন্ধে। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাংলা প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তাঁর ‘স্বরূপের সন্ধানে’ (১৯৭৬) পুস্তকে ; আর মূলের ইংরেজি প্রবন্ধ দুটি পাওয়া যাবে তাঁর ‘Creativity, Identity and Reality’ (1991) নামক গ্রন্থে।

১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে টোকিওতে ইউনেস্কো আয়োজন করল এশিয়ার সাংস্কৃতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতিনিধি সভা। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে কিছু গবেষণা-প্রস্তাব প্রেরণ করা। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি দপ্তরের মনোনয়নে আনিসুজ্জামান গেলেন জাপান। তাঁর দেশের সাংস্কৃতিক গবেষণার সমকালীন গতিপ্রকৃতি বিষয়ে নির্ভেজাল তথ্য তুলে ধরলেন তাঁর পেপারে। পরের বছর মার্চে গেলেন লণ্ডন। ডাক এসেছিল ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির পরিচালক জোন ল্যানকাস্টার-এর কাছ থেকে। তাঁরা চান ওই লাইব্রেরির রেকর্ডসে পড়ে থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠির কাগজপত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করতে। তিন মাসের জন্য তাঁরা স্কলার নিয়োগ করলেন আনিসুজ্জামানকে। অবশ্য একবারের যাত্রায় সব কাজ শেষ করতে পারেননি। পরে আবিষ্কৃত ফাইলের জন্য আবারও তাঁকে যেতে হয় দু’বছর পর। এই একাডেমিক প্রয়াসের ফল হল ১৯৮১-তে প্রকাশিত তাঁর সম্পাদনায় ‘Factory correspondence and other Bengali documents in the India Office Library & Records’।

১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকার হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সে দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার যে উদ্যোগ গ্রহণ করে ও ৯ সদস্যের নথি প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করে আনিসুজ্জামান তার একজন বিশিষ্ট সদস্য হিসেবে গৃহীত হন। তিনি এই কমিটির প্রধানকে পরামর্শ দেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথাসিদ্ধ ইতিহাস রচনা না করে তার দলিলপত্র সংকলন করতে। কারণ তাঁর মতে, সরকারি উদ্যোগে লেখা ইতিহাস খুব কমক্ষেত্রেই পক্ষপাতহীন হয়। কিন্তু দলিল নিজে থেকেই এক ধরনের সত্য প্রকাশ করে। আনিসুজ্জামানের এই বিজ্ঞ পরামর্শ বাকিরা মেনে নেন এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রচুর তথ্যাবলি সংগৃহীত হয়ে মোট ১৫টি খণ্ডে প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-যুদ্ধ : দলিলপত্র’ নামের এক প্রামাণ্য ইতিহাস। গ্রন্থের নামকরণে আনিসুজ্জামানের পরামর্শের প্রতিফলনটি লক্ষণীয়।

জাপানে দ্বিতীয়বার অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের যাওয়ার সুযোগ এল ১৯৭৮-এর নভেম্বরে। এবার কিয়োটোতে। সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘Asian Symposium on Intellectual creativity in Endogenous Culture’ শীর্ষক এক সেমিনার। অনুষ্ঠানের আয়োজক জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়। সেমিনারের কেন্দ্রীয় বিষয় দেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা। আনোয়ার আবদেল মালেকের চিঠি পেয়ে গেলেন এবং খুব সংক্ষেপে সামাজিক পটভূমির সঙ্গে সৃজনশীলতার সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করলেন। তাঁর বক্তব্য প্রশংসিত হল।

জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে আনিসুজ্জামান গিয়েছিলেন আলজিরিয়া। এখানকার সেমিনারের বিষয় – ‘Culture and thought in the Transformation of the World’। আলজিরিয়া থেকে এলেন ফ্রান্সে। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনালকো’ (আঁস্তিত্যু নাসিওনাল দ্যে লংগ এ সিভিলিজাসিওঁ ওরিয়ঁতাল)-তে ফ্রাঁস ভট্টাচার্যের আহ্বানে দিলেন একটি বক্তৃতা। এরপর প্যারিস থেকে লণ্ডন। লণ্ডনে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধীন নবীনতম রবিনসন কলেজে যোগদান করলেন একটি বিশেষ আলোচনাচক্রে। তার শিরোনাম ‘Geo-Political Visions of the world’। ১৯৮৩-র জানুয়ারি। এবার জাপান। এটা তৃতীয়বার। গেলেন ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। পরে যাবেন কুয়েত। সেখানে বলবেন ‘An out-sider’s view of Arab Indigenous Intellectual Creativity’ নিয়ে। আরও পরে পা পড়বে শ্রীলঙ্কায়, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের এক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে। আর তাঁর প্রকৃত জন্মভূমি, পরবর্তীকালে প্রতিবেশী রাষ্ট্র, ভারতে যে গবেষণা, সেমিনার, ভিজিটিং ফেলো, বহিরাগত বিশেষজ্ঞ হয়ে কতবার এসেছেন তার পরিসংখ্যান দেওয়া বাহুল্যমাত্র। তবু ১৯৯৩ সালের দুটো বক্তৃতার তথ্য কেবল দেওয়া যাক। ওই বছর এপ্রিলে ‘ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস’ ও ইউনেস্কো যৌথ উদ্যোগে দিল্লিতে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। বিষয় – ‘Interface of Cultural Identity and Development’। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সেখানে বক্তা হিসেবে আহূত। আর ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত ইন্দিরা গান্ধী স্মারক বক্তৃতায় বললেন ‘Cultural Pluralism’ নিয়ে।

না, আর উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই । এই বরেণ্য শিক্ষক, প্রগতিশীল সংস্কৃতি-চিন্তক, আদ্যন্ত সমাজ-মনস্ক মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। সত্যি সত্যিই ছিল যেন তাঁর পায়ের তলায় সর্ষে। ১৯৬৪-তে সেই যে দেশের সীমানা টপকাতে শুরু করলেন টানা সাড়ে পাঁচ দশক চলল তাঁর নানা দেশে সাংস্কৃতিক সফর। এই সুবাদে অজস্র জ্ঞানী-গুণী পণ্ডিত মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। তাঁরা যে সবাই শিক্ষাক্ষেত্রের ছিলেন তা নয়, তাঁদের কেউ রাষ্ট্রনায়ক, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ শিল্পী, কেউ স্থপতি, কেউ প্রকৌশলী, কেউ জননায়ক। তাঁর বাড়িতে অতিথি হয়েছেন ক্লিন্টন বি সিলির মত জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর –- জীবনের এই তিন পর্বের ঘটনাবলি নিয়ে গড়ে তোলা স্বতন্ত্র তিনটি গ্রন্থে তাঁর প্রথম ষাট বছরের আত্মকথন থেকে বোঝা যায় কীভাবে নানা চেতনার সমবায়ে নির্মিত হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিসত্তাটি। পার্কসার্কাসের এক অখ্যাত স্কুলের অতি সাধারণ পড়ুয়া থেকে তিনি কীভাবে নিজের মেধা, মনন, জেদ আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে দিনে দিনে হয়ে ওঠেন একজন ইন্টারন্যাশনাল প্রোফাউণ্ড স্কলার সে কথা ভাবলে অবাক হয়ে যেতে হয়। তাঁর আত্মজীবনীতে জীবনের ভালো-মন্দ, চরিত্রের সাদা-কালো কোনো দিকই গোপন করেন না, লুকিয়ে রাখেন না পরিবারের মুসলিম লিগ প্রীতি, দেশভাগকালীন ভয়ার্ততার কথা। ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলতে তিনি নির্ভীক। তিনি সুযোগসন্ধানী নন কিংবা অনুগ্রহ ভিক্ষার পাত্র নন। তিনি ক্ষমতাশালীর সামনেও স্পষ্টবক্তা, সাধারণ মানুষের কাছে উপকারী মহদাশয়, পরিবারের কাছে ঘরোয়া, বন্ধুবান্ধবের কাছে সদালাপী এবং নিজের কাছে আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন। প্রবল কর্মব্যস্ততার মধ্যেও ভুলে যাননি দায়িত্বজ্ঞান, সময়ানুবর্তিতা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, লঙ্ঘিত হয়েছে মানবাধিকার। এসব ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা নিয়েছেন ন্যায়ের পক্ষ, সাধারণ নাগরিকের সুবিধার দিকে দিয়েছেন নজর। প্রয়োজনে জনআন্দোলনেও দিয়েছেন নেতৃত্ব। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে যখন জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পাকিস্তানি স্বৈরাচারের সহযোগী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠিত হয়েছিল তিনি তখন একজন অভিযোগকারী হিসেবে নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর ফলে আইনভঙ্গের দরুণ তাঁর বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া সরকার মামলা দায়ের করে। তিনি সৎ সাহসের সঙ্গে সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন। এর পাঁচ বছর পর ১৯৯৬-এর জানুয়ারিতে খালেদা জিয়ার পুলিশ বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব চালালে তিনি তার প্রতিবাদে রাজপথে নামেন। একই রকম ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের যৌথ আঁতাতে সংঘটিত দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলা ও নির্যাতনে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হলে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর যখন গ্রেনেড হামলা হয় কিংবা তার আগে মুক্তবুদ্ধির মানুষ হুমায়ুন আজাদকে হত্যার চেষ্টা করা হয়, তখন তিনি প্রতিবাদ বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন। এইসব ঘটনা থেকেই বোঝা যায় মানুষটির স্বভাব-প্রকৃতি, চিন্তা ও চেতনার রং। আপন স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল, চরিত্রগুণে বিভূষিত, বাক্স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, মানবাধিকার রক্ষায় অটল এই মানুষটিকে তাই কেউ কেউ ‘জাতির জাগ্রত বিবেক’বলে মনে করেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বহুধাব্যাপ্ত কর্মকাণ্ডের আর এক টুকরো পরিচয় দিই। তিনি ভিজিটি্ং ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন কলকাতার মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ (১৯৯৪), প্যারিস ইউনিভার্সিটি (১৯৯৪), নর্থ ক্যারোলাইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (১৯৯৫)। ২০০৮ থেকে ’১১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক গবেষণা প্রকল্পে (DRS Project Under SAP) তিনি ভিজিটিং ফেলো হিসাবে আহূত হয়ে ২০১০ সালে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান কলমচি। বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলেছিলেন সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়ে। এর একটি হল নজরুল ইন্সটিটিউট ও অন্যটি বাংলা একাডেমি। বাংলা মাসিকপত্র ‘কালি ও কলম’ এবং শিল্পকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘যামিনী’-র তিনি ছিলেন সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। এছাড়া ‘আন্তর্জাতিক বঙ্গবিদ্যা পরিষদ’নামে একটি বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ অধ্যায়ের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন বিগত এক দশক ধরে। দেশে–বিদেশে এমন আরও যে কত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে তার পরিসংখ্যান পাওয়া অসম্ভব।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন একজন বড়ো মাপের একাডেমিসিয়ান, ধীমান অধ্যাপক। পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক হিসেবে তিনি যুক্ত ছিলেন দু’দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে। ১৯৫৯ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত লেকচারার পদে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর চলে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে। সেখানে ছিলেন ১৯৮৫ পর্যন্ত। এখানে থাকবার সময়ে তিনি দু’দুবার কলা অনুষদের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। আবার ১৯৮৫-তে ফিরে আসেন তাঁর মাতৃপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে বরিষ্ঠ অধ্যাপক পদে বৃত ছিলেন ২০০৩ সাল পর্যন্ত। পরে তাঁকে নিয়োগ করা হয় সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক রূপে। পরে হন এমোরিটাস প্রফেসর এবং সবশেষে ন্যাশনাল প্রফেসর (নিযুক্তি ১৯ জুন ২০১৮)। তাঁর কাছে যাঁরা পাঠ নিয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতায় ধরা আছে তাঁর সুনিপুণ রসবোধ ও বাচনিকতার জাদু। তাঁদের ভাষায়, তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। ক্লাসেই নাকি বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বয়স বাড়ে, ছাত্রদের বাড়ে না, সেজন্য শিক্ষকদের দায় অনেক। সেই দায়বদ্ধতার পরিচয় যেমন রাখতেন শ্রেণিকক্ষের অভ্যান্তরে, তেমনি বাইরেও। তিনি অনেকটাই বহির্মুখী ও মিশুক প্রকৃতির ছিলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুভাবে মিশতেন যথেষ্ট, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা দেখতে গিয়ে মাত্রাজ্ঞান হারাতেন না কখনোই। ক্লাসে স্বল্পকথায় মূল বক্তব্য পরিবেশনে নৈপুণ্য ছিল তাঁর। বাঁকা কথা কিংবা ফাঁকা বুলি পারতপক্ষে বর্জন করে চলতেন। কোনো বিষয় সম্পর্কে গভীরে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীকে জোগাতেন নতুন ভাবনার খোরাক। তাঁর অধীত বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হলেও নিছক সাহিত্যের রসতাত্ত্বিক ব্যাখায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না তিনি। তাঁর এই স্বভাবের প্রমাণ রয়ে গেছে যাবতীয় অ্যাকাডেমিক লেখাপত্রে। সমাজের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক অন্বেষণে তিনি ক্লান্তিহীন এক অভিযাত্রী। আধুনিক যুগের সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েই তিনি ছিলেন বেশি মাত্রায় উৎসাহী। বাঙালি মুসলমান সমাজের কালিক রূপান্তর যে তাঁকে গভীর ভাবে আকর্ষণ করেছিল তার প্রমাণ রয়ে গেছে তাঁর ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৬৪) ও ‘মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র, ১৮৩১-১৯৩০’ (১৯৬৯) বই দুটিতে। মুক্তিযুদ্ধের কালে পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে নিহত হন তাঁর শিক্ষক মুনীর চৌধুরী। তাঁকে নিয়ে একটি জীবনীগ্রন্থ লিখেছিলেন ১৯৭৫ সালে। ‘স্বরূপের সন্ধানে’ (১৯৭৬) বইটিতে আধুনিকের সঙ্গে মধ্যযুগও আলোচিত। এ সম্পর্কিত তাঁর দুটি প্রবন্ধ খুবই উল্লেখযোগ্য – ‘চর্যাগীতির সমাজচিত্র’ এবং ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য : সমাজের কিছু চিত্র’। এই বইগুলি ছাড়া বিদ্যায়তনিক শৃঙ্খলায় লিখেছেন ‘আঠারো শতকের বাংলা চিঠি’(১৯৮৩), ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’ (১৯৮৪), ‘বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে’ (২০০০) এবং ‘পূর্বগামী’ (২০০১)। ‘কাল নিরবধি’(২০০৩), ‘আমার একাত্তর’(১৯৯৭) ও ‘বিপুলা পৃথিবী’(২০১৫) — এই তিনটি ধারাবাহিক আত্মকথন ছাড়া লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পর’(১৯৯৮) ও ‘আমার চোখে’ (১৯৯৯)। ইংরেজিতে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর তিনটি গ্রন্থ – ‘Creativity, Identity and Reality’ (1991), ‘Cultural Pluralism’ (1993) এবং ‘Identity, Religion and Recent History’ (1995)। তাঁর একক ও যৌথভাবে সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ’ (১৯৬৮), মুনীর চৌধুরী রচনাবলী, ১ম-৪র্থ খণ্ড (১৯৯৩), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী, ১ম ও ৩য় খণ্ড (১৯৯৪-৯৫), আবু হেনা মোস্তাফা কামাল রচনাবলী, ১ম খণ্ড(২০০১)। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘Culture and Thought’ (1983), ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড (১৯৮৭), ‘SAARC : A People’s Perspective’ (1993), ‘আইন-শব্দকোষ’ (২০০৬) ইত্যাদি গ্রন্থ।

তাঁর সুবিপুল পাণ্ডিত্য ও দুনিয়াব্যাপী খ্যাতি তাঁকে নানা সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তো পি-এইচ.ডি. ডিগ্রি পেয়েছিলেনই, এছাড়া লাভ করেছিলেন নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক (১৯৫৬)। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান লেখক সংঘ তাঁকে দেয় দাউদ পুরস্কার। ১৯৭০ সালে পান বাংলা একাডেমির তরফে সাহিত্য পুরস্কার। শিক্ষায় তাঁর আসামান্য কৃতিত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদক’দ্বারা ভূষিত হন ১৯৮৫-তে। ১৯৯৪ সালে পান ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’সিরিজের জন্য আনন্দ পুরস্কার। ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. লিট. ডিগ্রিতে ভূষিত করে। ২০০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান সরোজিনী বসু পুরস্কার। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি ২০১১ সালে তাঁকে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে। ২০১৪ সালে ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে লাভ করেন ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি। পরের বছর বংলাদেশ সরকার সাহিত্যে তাঁর অবদান স্মরণে রেখে প্রদান করে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৬ সালে পান ‘স্টার লাইফ-টাইম অ্যাওয়ার্ড’। দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন ২০১৭-তে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের আত্মকথন ‘বিপুলা পৃথিবী’ বইটির জন্য। ২০১৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে সাহিত্য বিষয়ক সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’-এ ভূষিত হন। আর নিজের দেশে বৃত হন ‘জাতীয় অধ্যাপক’-এর অতি সম্মাননীয় পদে। তাঁর হাতে পদক ও শংসাপত্র অর্পণ করেছিলেন তাঁরই প্রাক্তন ছাত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া ওই বছরেই মিলেছিল খান বাহাদুর আসানুল্লাহ স্বর্ণপদক। আর ২০১৯-এ পান সার্ক কালচারাল সেন্টার থেকে সার্ক সাহিত্য পুরস্কার।

‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’। জীবনানন্দের এই উচ্চারণ আক্ষরিক ভাবে কতখানি সত্য আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি আমরা। বিশ্বত্রাস করোনা ভাইরাস তার ভূখণ্ডগত ব্যাপ্তিতে হার মানিয়েছে দুনিয়া-কাঁপানো দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধকে। এই অতিমারীর ভয়ঙ্কর থাবার নিচে যখন বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ ত্রস্ত, কম্পিত, তখন পৃথিবীজুড়ে একের পর এক ইন্দ্রপতন হয়ে চলেছে। গত ১৪ মে ২০২০ বিকেল ৪টে ৫৫ মিনিটে করোনার করালগ্রাসে পতিত হয়ে ৮৩ বছরে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। শিক্ষা-সংস্কৃতির জগতের মানুষ হয়ে তাঁর মতো বিপুল আন্তর্জাতিক খ্যাতি বাংলাদেশে অধুনাতন কালে আর ক’জনইবা কুড়িয়েছেন! আট দশকেরও বেশি সময়কালে তাঁর ব্যক্তিত্ব নানা পরিচয়ে ভূষিত হয়েছে। তাঁর স্বদেশ তো তাঁকে বরণ করেছেই, বিদেশ থেকেও অর্জন করেছেন প্রভূত সম্মান। তাঁর জন্য বাংলাদেশ আজ গর্বিত। কী নন তিনি? তিনি একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চোখে পড়ার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ; ছিলেন একদা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা। আজকের এই কালবেলায় এমন এক বর্ণময় ব্যক্তিত্বকে আমরা স্মরণ করছি অকৃত্রিম শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়। বর্তমান ২০২০ খ্রিস্টাব্দ বাংলাদেশের কাছে এক উল্লেখযোগ্য স্মারক বৎসর। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়েছিল। তাই বৎসরটিকে সে দেশের আওয়ামি লিগ সরকার জাঁকজমক সহকারে পালন করছিল ‘মুজিববর্ষ’হিসেবে। এই উৎসবের উদ্যাপন কমিটির অন্যতম পুরোধা ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অবশ্য সেই উৎসব কিছুটা জৌলুশ হারিয়েছে বর্তমানে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণে। আর সেই কালান্তক ব্যাধির কালে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেন এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের বিরল গুণসম্পন্ন মানুষটি। হয়তো তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই শেষ হল বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.