সাহিত্য ও সিনেমার সম্পর্ক নিয়ে যত কথা

সংবাদ জমিন, অনলাইন ডেস্ক ঃঃ

সাহিত্য সমাজের বিশ্বস্ত দর্পন। তাই এতে সর্বদাই আলোচিত হয় সমাজের হালচিত্র। অন্যদিকে চলচ্চিত্র বা সিনেমা মানুষের বিস্ময়কর সৃষ্টি। কারণ একই সাথে চলমান, দৃশ্যমান এবং ভাষা সম্বলিত মাধ্যম আর দ্বিতীয়টি নেই। তবে সাহিত্যের উৎপত্তি অনেক পুরোনো বলে এর সঠিক সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। পক্ষান্তরে চলচ্চিত্র পুরোপুরি বিদেশীদের দান। এর প্রস্তুতি শুরু হয় ১৬৬০ সালের দিকে গ্লাস স্লাইড দিয়ে ম্যাজিক ল্যানটার্ম দেখানোর মধ্য দিয়ে।পরবর্তীকালে সফলভাবে প্রদর্শিত হয় ১৮৯৬ সালে থিয়েটারস্কোপ যন্ত্রের মাধ্যমে। এবার আসা যাক ভারতীয় সিনেমার সূচনা প্রসঙ্গে। উপমহাদেশীয় সিনেমা জন্মলগ্ন থেকেই সাহিত্যের হাত ধরে হাটতে শিখেছে। ভারতের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ ছিলো পুরোপুরি সাহিত্য নির্ভর। বাংলা সিনেমার ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত ছিলো নির্বাক যুগ। উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’ ও নির্মিত হয়েছিল নরেন্দ্র মুখোপাধ্যায় এর সাহিত্য নিয়ে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র উপাদান সংগ্রহ করলেও চলচিত্রের রয়েছে আলাদা স্বতন্ত্রতা। কারণ চলচিত্র সেই কাহিনীকে আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে নতুনভাবে রচনা করে। একটি গল্প বা আখ্যানের ভিস্যুয়ালই চলচ্চিত্র নয় আবার চলচিত্রের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছেরও নয়। তাই সমালোচক অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, সাহিত্যের সাথে চলচিত্রের সম্পর্ক ভাসুর-ভাদ্রবৌ গোছেরও নয়। সেক্ষেত্রে দেবীকুমার বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, বিমল রায় থেকে শুরু করে সত্যজিত রায়, ঋতিক ঘটক, মৃণাল সেন অজয় কর, তরুণ মজুমদার অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় থেকে এখনকালের ঋতুপর্ণা ঘোষ, বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, কমলেশ্বর মুখার্জিসহ প্রত্যেকের চলচ্চিত্রে সাহিত্য নির্ভরতা বিদ্যমান। এ সাহিত্য নির্ভরতা বাংলা চলচ্চিত্রকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বানিজ্য সফলতার সঙ্গে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি-সম্মানও। কারণ সাহিত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এতে চলচ্চিত্র শিল্পমূল্য বিদ্যমান ছিলো। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া পথের পাঁচালি চলচ্চিত্রটি আসলে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাস অবলম্বনে রচিত।  তবে সাহিত্য-নির্ভরতা ছাড়া যে এ শিল্পটি দাড়াতে পারবে এটি বলারও সুযোগ নেই। কারণ আমরা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমাটির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই দেখতে পাই সাহিত্য ছাড়াই এটি একটি সফল সিনেমা। বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসেও নিও-রিয়েলিজমের যুগে চলচ্চিত্রকারদের সাহিত্য থেকে সরে আসার চেষ্টা দেখা যায়। এই সময়ের পরিচালকেরা রঙচঙে কৃত্রিম জীবনের পরিবর্তে আনলেন সাদামাটা জীবনেরই দৃশ্যপট। এ প্রসঙ্গে সমরেশ মজুমদার বলেছেন, যেহেতু চলচিত্রও মানুষের জীবনযাত্রা এবং সমাজকে ফুটিয়ে তোলে তাই যারা সাহিত্য ছাড়া চলচিত্র নির্মাণ করেন তারাও ভিতরে ভিতরে সাহিত্যিকই বটে। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে পুর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন, সাহিত্য এবং সিনেমার সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মত। প্রায়শই নিবিড় মিলন কিন্তু মাঝে মাঝেই বিচ্ছেদ বিরহ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিবাহ বন্ধনের রাঙা রাখী ছিড়ে যায় অনতিবিলম্বে। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালকদের সাহিত্যের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণকেও তিনি মেনে নেননি। পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্য ও সিনেমা দুটিই শক্তিশালী মাধ্যম এবং পরস্পরে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। সাহিত্যের ব্যপ্তি বহুদূর সমৃদ্ধ এবং সিনেমাও বৃহৎ অংশকে খুব সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।

লেখকঃ রেজওয়ান আহম্মেদ, ইংরেজি ডিসিপ্লিন, ২য় বর্ষ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.