করোনা ও মানব সভ্যতার বিপর্যয় নিয়ে সাহিত্য কথা

অনলাইন ডেস্ক ঃঃ আলব্যের ক্যামু (১৯১৩-১৯৬০) বংশের দিক থেকে ফরাসি পিতা আর স্প্যানিশ মায়ের রক্ত বহনকারী পুত্র। তিনি তৎকালীন উত্তর আফ্রিকান ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার মান্দোভি নামক স্থানে জন্মান। মাত্র চারটি উপন্যাস, একটি ছোটোগল্পের সংকলন, ছয়টি প্রবন্ধের বই আর সাতটি নাটক- এই হচ্ছে আলব্যের ক্যামুর সাহিত্যের অতি সামান্য সম্বল, যা তাকে বিশ্বসাহিত্যের অংশীদার করেছে। দর্শনের ছাত্র এবং অস্তিতবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী ক্যামু রচিত ‘দ্য প্লেগ’ এবং ‘দ্য আউটসাইডার’ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে মহাযুদ্ধ ও মহামারির বাস্তবতাকে তিনি তার উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে স্থান পেয়েছে ব্যক্তির অস্তিত্বের সংকট, মনস্তাত্ত্বিক দিক ও সংগ্রামের আলেখ্য। শুধু ক্যামু নন, যুদ্ধ, মহামারি, বিপর্যয় ইত্যাদি মানবিক বিপদ বার বার বহু মহৎ লেখকের কালজয়ী বর্ণনার হাত ধরে সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। রুশ দেশের রূঢ় বাস্তবতার ভাষ্যকার হয়েছেন গোর্কি, তলস্তয়। বাংলা সাহিত্যে মহামারি, মন্বন্তর, দেশভাগ ও মানবিক বিপর্যয় চিত্রিত করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধায়, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং আরও অনেকের কুশলি কলমে । কৃষাণ চন্দর, সাদাত হাসান মান্টো, অমৃতা প্রীতম, খাজা আহমাদ আব্বাস উপমহাদেশের মহাযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে দেশভাগ জনিত দাঙ্গা, মৃত্যু, দেশান্তরে কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও হাজার মানুষের মৃত্যুতে আবর্তিত চরম মানবিক বিপর্যয়কে উপজীব্য করেছেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে দেখিয়েছেন মানুষ ও অমানুষের মুখ। সাহিত্যে মানবিক বিপর্যয় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। সে বিপর্যয় যুদ্ধ, দাঙ্গা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি ইত্যাদি নানা আঘাতের কারণে ঘটেছে। মহাকাব্যেও বিপর্যয়ের বিবরণ আছে। এবং সর্বসাম্প্রতিক সাহিত্যের বিভিন্ন ধারাতেও সে ছাপ সুস্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। বেলারুশের সাংবাদিক-লেখিকা সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তার ‘অ্যা মনুমেন্ট টু সাফারিং অ্যান্ড করেজ ইন আওয়ার টাইম’ উপন্যাসের জন্য। যে কাহিনীভাষ্যটি চেরনোবিলে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চরম পরিণতির সরেজমিন তদন্তের নির্যাসমিশ্রিত ন্যারেশান। যুদ্ধ ও মহামারির ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজ্ঞান যেমনভাবে বিপদমুক্তির ও প্রতিষেধকের পথ-সন্ধান করে, সাহিত্য ঠিক তেমনভাবে অগ্রসর না হলেও অন্যভাবে মানুষের বেদনা, আর্তি, বিপর্যয় ও সংগ্রামশীলতাকে রেকর্ড করে। মানুষের এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতাসমূহ স্থান ও কালের নিরিখে বদলে যায়, কিন্তু ঘোরতর ক্রান্তিলগ্নেও মানুষের বেঁচে থাকার আশাবাদী শিক্ষাটি ঠিকই মানব সভ্যতার ইতিহাসের পাতায় সাহিত্যের আবহে লিপিবদ্ধ করে রেখে যায়। করোনাভাইরাসের প্রবল বিশ্বমহামারির সময় আলব্যের ক্যামুর ‘দ্যা প্লেগ’-এর মতো প্রেক্ষাপট বিরাজমান নয়। কিন্তু সে সময়ের মতোই আতংক ও পেনিক বিরাজমান। ফলে সে পরিস্থিতির চরিত্রগুলোই যেন উপন্যাসের পাতা ফুঁড়ে বের হয়ে আসছে বর্তমান দৃশ্যপটে। মানবিক বিপদ ও বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নায়ক যেমন তখনো ছিলেন, এখনো আছেন। আছেন খল নায়কও। রোগের ভয়ে প্রিয়জনকে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জানাজা ও কবরস্থ করার লোক পেতে অসুবিধা হয়েছে। রোগ সংক্রামিত হওয়ার ভয়ে, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮০০ শতাধিক ডাক্তার চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার অন্য তথ্যও আছে। করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রথম পূর্বাভাস দেওয়া চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরের চক্ষুচিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং এবং আরও কমপক্ষে দেড় শতাধিক চিকিৎসক করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে বিশ্বের নানা জায়গায় প্রাণ দিয়েছেন। ক্যামুর উপন্যাসেও তেমন বিপরীতধর্মী চরিত্র আছে। উপন্যাসের নায়ক ডাক্তার রিও’র মানবসেবার উজ্জ্বল বিবরণ বর্তমানের বিপন্ন পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যে উদ্ভাসিত হয়েছে। প্লেগের বীজাণুনাশক টিকা আবিষ্কারক ডাক্তার ক্যাসেলের মতো প্রাণান্তর চেষ্টায় করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় কাজ করছেন বহু চিকিৎসাবিজ্ঞানী। সচারদিকের করোনার মহামারি, মানব বিপর্যয় ও হতাশার মধ্যে অর্থগৃধ্নু, লুটেরা, মজুদদার, মুনাফাখোর ও আত্মস্বার্থের ক্ষুদ্র মানুষদেরও দেখা যাচ্ছে, যারা বিপদের সুযোগ নিয়ে নিজের বিকৃত ও লোভাতুর মানসিকতা চরিতার্থ করছেন। ‘দ্যা প্লেগ’র খলচরিত্র, অবসাদগ্রস্ত বৃদ্ধ কটার্ডের কথা শুধু মনেই পড়েনা, তাদের মতো অনেককেই দেখাও যাচ্ছে আশেপাশে। কটার্ড শুধু নিজেকে বাঁচানোর চিন্তায় ছিলেন মশগুল। এজন্য প্লেগের বিরূপ পরিস্থিতিতে নিজেকে জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সারাক্ষণ দরজা-জানালা বন্ধ করে অন্যের অনিষ্ট চিন্তা করতেন। এক সময় তিনি মানুষের বিপদ দেখতে বের হন। প্লেগের মারাত্মক মহামারি রূপ দেখে উৎফুল্ল হন কটার্ড। মানুষের মৃত্যুর মিছিল আর দুর্ভাগ্য দেখে কটার্ড খুশি হন। কিন্তু কটার্ডের সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়না। ডাক্তার ক্যাসেল প্লেগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হন আর ডাক্তার রিও জীবনবাজি রেখে অসুস্থ মানুষদের সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলতে থাকেন। পরাজিত প্লেগ যখন মাথা নিচু করে আপন গুহায় ফিরে যাচ্ছিল, তখন কাটার্ডও আবার তার গণ্ডিবদ্ধ জীবনের ফিরে যাচ্ছিলেন নতমুখে। ফিরে গিয়ে মানবতার দরজা-জানালা আবার বন্ধ করে দেন কটার্ড। সংকটে, বিপদে, বিপর্যয়ে মানবতার দরজা খোলার এবং বন্ধ করার লোকের অভাব হয়না। অতীতের প্লেগ, কলেরা, ফ্লু কিংবা যুদ্ধ, ধ্বংস, তাণ্ডবের সময় মানবতার পক্ষে ও বিপক্ষে দাঁড়িনোর লোকেরও কম পড়েনি। চলমান করোনাভাইরাসের প্রবল বৈশ্বিক মহামারির সময়ও মানব বংশের কিছু কিছু সদস্য মানবতাকে বেছে নিচ্ছেন, কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন মানবতার বিরুদ্ধ শিবিরে। সাহিত্যের আয়নায় মানবিক বিপর্যয়ের সংকুল পরিস্থিতিতে সেই মিত্র আর শত্রুর চেহারাগুলোই সুস্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.