কলাম : যাদের স্বাস্থ্যসেবার কাছে আমরা ঋণী

সিরাজুল ইসলাম আন্নু ঃঃ
যা কিছু হারিয়ে যায় তার অনেক-ই খুঁজে পাওয়া যায়। হারিয়ে খুঁজে পেলেও তার মূল্য বেড়ে যায়। এমন কিছু আছে যা হারিয়ে খুঁজে পেলেও তার স্মৃতি বড়ই কষ্ঠদায়ক। তেমনি এক কষ্টদায়ক স্মৃতি আজ আমাকে বড়ই যন্ত্রণা দিয়েছে।
কোহিনূর মেডিকেল হল। শুধু সিঙ্গাইর বাজার নয়, সবগুলো ইউনিয়নের লোকেরা এক নামেই চিনত। কোহিনূর মেডিকেল হল ছিলো বাজারের ল্যান্ডমার্ক। অন্য কোন দোকানের পরিচয় ও লোকেশন মানুষ নির্ধারণ করত কোহিনূর মেডিকেলের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ বলে চিহ্নিত করে। কোহিনূর মেডিকেলের অবস্থান সময়ে বদলিয়েছে। প্রথমে ছিলো কেন্দ্রীয় মসজিদের রাস্তার পূর্বদিকে। স্বাধীনতাউত্তর কালে কিছুদিন সেখানে ছিলো তারপর বাজারের মধ্যখানে এবং সর্বশেষ এখন যেখানে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হয়।
প্রত্যেক অবস্থানে একজন ডাক্তার বসে রোগীদের পরামর্শ দিতেন তাহার নাম জনাব মীর আবুল খায়ের, (ঘটু ডাক্তার) । তিনি ছিলেন তৎকালীন ন্যাশনাল মেডিকেল থেকে প্যাথোলজীর উপর ডিগ্রী পাশ। তিনি প্যাথোলজীর পাশাপাশি রোগী দেখতেন। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং সমর্থকদের রাজনৈতিক আলাপ করতেন। যাদেরকে বেশি দেখেছি জনাব যাদব চন্দ্র সাহা, বাবু অমীয় রায়, জনাব তোফাজ্জল হোসেন বিএসসি স্যার, জনাব আব্দুল হালিম, ছুটিতে আসা ঢাকা ভার্সিটির রেজিস্ট্রার জনাব আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। আরও অনেকে আসতেন নাম মনে পড়ছেনা। আর ছিলেন আমার পিতা জনাব সাহাবুদ্দিন আহমেদ। রাজনৈতিক আলাপের সাথে চলতো জম্পেশ আড্ডা। ১৯৭৩ সনের এমপি নির্বাচনে জনাব মীর আবুল খায়ের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আরো একটি বড় ফার্মেসী ছিলো ‘দি পাশা মেডিকেল হল’। যার মালিক ছিলেন আজিমপুরের ভেটেরনারী ডা. তোফায়েল আহমেদ সাহেবের সম্মুন্দি, মুক্তিযোদ্ধা, ইরতার জনাব ওবায়েদুর রহমান। সেই ফার্মেসীতে বসতেন জনাব ডা. জামালউদ্দিন আহমেদ। অনিবার্য কারণে তিনি চলে গেলে সেখানে বসতেন বৃদ্ধ কোয়াক রাজ্যেশ্বর। তিনি ডানে-বামে কাত হয়ে চলতেন।
বাজারের মধ্যখানে কামরুন মেডিকেল হল যার মালিক ছিলেন ডাক্তার জনাব কেরামত আলী। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল মেডিকেল ডিগ্রী পাশ। তিনিও খুব সজ্জন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন খুব রোগী-বান্ধব ডাক্তার।
একটা ফার্মেসী সম্ভবত নাম যমুনা ফার্মেসী, সেখানে বসতেন এলএমএফ পাশ, পরে কন্ডেন্সড্ এমবিবিএস ডা.বাবু গোকুল চন্দ্র মন্ডল।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ডাক্তারী করতেন তার নাম গবা ডাক্তার। তিনি বড় বড় পকেটওয়ালা হাওয়াই সার্ট পরতেন কারণ তার পকেট-ই ছিলো একটা ডিসপেনসারি। পকেটে ওষুধ নিয়ে বিক্রি করতেন।
সিঙ্গাইরের যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন ছিলো চরম খারাপ। ঐ দুঃসময়ে এ মহান ডাক্তারেরা স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। আমরা সিঙ্গাইর বাসীরা সত্যিকার অর্থে তাঁদের কাছে ঋণী। আজ তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। যেখানে থাকুন শান্তিতে থাকুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.

শিরোনাম