বন্যায় এবার ঈদ আনন্দ নিরানন্দে পরিনত হয়েছে

জামালপুর প্রতিনিধি ঃঃ

‘পেঠেই ভাত দিবার পাইতাছি না আংগরে আবার ঈদ! পুলাপান কান্দাকাঠি করতাছে, ঈদ আইয়া পড়লো নয়া কাফর কিনা দেও। পেঠে ভাতই দিবার পাইতাছিনা নয়া কাফর কিন্যা দিমু ক্যামনে। আল্লায় আমগো কফালে ঈদের আনন্দ লেহেনাই।’ এভাবেই চোখের পানি ফেলে কষ্টের কথা জানালেন ইসলামপুরের পার্থশি ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের মৃত সাকোয়াত হোসেনের স্ত্রী ৬০ বছর বয়সি বানভাসি হিমানি বেগম। একটু এগিয়ে গেলে কথা হয় চামেলা বেগমের (৩০) সঙ্গে। তিনি জানান, স্বামী অসুস্থ, টাকার অভাবে বাড়িঘর ঠিক করতে পারছেন না। ত্রাণ পেলে পেটে আহার জুটে। একবেলা খেলে অন্যবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। ছেলে-মেয়েদের চোখেমুখে তাকাতে পারছে না। ঈদে নতুন কাপড়ের বায়না ধরে কান্নাকাটি করছে। অবুঝ সন্তানরা আমার অসহায়ত্বের কথা বুঝাতে চাইছে না বলে আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেলেন।

একই গ্রামের আবুল হাসেম। বয়স ৫৫। চার ছেলেমেয়ে স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। কঙ্কালসার শরীর। বন্যাকালীন ঠিকমতো খেতে না পেয়ে শরীর ভেঙে পড়েছে আবুল হাসেমের। আমাদের দেখে ত্রাণকর্মী ভেবে ছুটে আসে সে। বলে বাবা বুড়া মানুষ ঠেলাঠেলি করে ত্রাণ নিতে পারি না। আমার নামটা লেখেন। আমরা সাংবাদিক পরিচয় দিতেই চুপ হয়ে যায়।

ঈদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই বলেন, ছেলে মেয়ে নাইনাতির চিৎকারে থাকতে পারছি না। যেহানে খাইতে পারি না কাফর কিনে দিমু ক্যামনে। আল্লায় ক্যান যে আমগো গরিব বানাইছে। তারমধ্যে বানে এবার ঈদের আনন্দ মাটি কইরা দিছে।

হামেলা, চামেলী ও হাসেমের মতো বন্যা দুর্গত এলাকায় সন্তানদের ঈদে নতুন কাপড়ের বায়না মেটাতে না পেরে সবাই একই কথা বললেন।

বন্যায় আক্রান্ত ইসলামপুরের পার্থশি ইউনিয়নের শেখ পাড়া, মন্ডলপাড়া, মোরাদাবাদ ও মরাডুবিসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে ঈদ আনন্দ নিরান্দে পরিণত হয়েছে। ঈদে নতুন কাপড়ের বায়নায় শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে ঘর ঘর থেকে। ঈদ আনন্দের বদলে জীবন বাঁচাতে ত্রাণের সন্ধানে ছোটাছুটি আর মাথা গোজার ঠাঁই করে রনিতে বাড়িঘর মেরামতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে বন্যাদুর্গতরা।

ঈদের আনন্দ নেই বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে। তাই ঘরে ঘরে ঈদ প্রস্তুতির লেশমাত্র নেই বললেই চলে।

বড় গৃহস্থ্য হিসেবে পরিচিত আবদুল মজিদ (৬৬)। এই সময়টা তিনি কোরবানির জন্য গরু কেনা, ঘরের বাজার সদাই আর পরিবার পরিজনের নতুন কাপড় কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পশু কোরবানি, দুস্থদের মধ্যে মাংস বিলানো, বাড়িতে মেহমানদারিতে আনন্দে কেটে যায় ঈদের দিন। কিন্তু এবার ছিঁটেফোটাও স্পর্শ করবে না তাকে। কারণ ফসল হারিয়ে তিনি নিঃস্ব, নিজেই এখন ‘দুস্থ’। সম্মানের ভয়ে চক্ষুলজ্জায় ত্রাণও নিতে পারছেন না, হাত পাততেও পারছেন না মানুষের কাছে। সংসারে দু’বেলা ভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। যমুনাপড়ের সর্বত্র দুর্গত মানুষের ধনী-গরিব সকলের ঈদ আনন্দ নিয়ে একই জীবনচিত্র বিরাজ করছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.